"ফেইস অফ" জেনারেশন

 

সন্তান সবে মাত্র সেভেনথ  গ্রেডে ওঠেছে। হাতে আইফোন। বাপকে বলছে- "বাবা ডোন্ট টাচ মাই ফোন"।

বাবাকে বললাম- দুঃখ করে লাভ  নেই। বারো তের বছরের মেয়ের হাতে আইফোনটা তোলে দিলো কে?

না চাইলেও দিতে হয়। স্কুলে সন্তানের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়।

একসময় এতো ভিডাইস ছিলোনা। কিন্তু তাই বলে যোগাযোগতো  নষ্ট হয়ে যায়নি। 

উনি আর কিছু বললেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

এই দীর্ঘশ্বাসটা বুকে এসে বিঁধলো। যে পিতা সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর প্রথম বুকে তোলে নিয়েছেন। সেই পিতাকেই সন্তান যখন বলছে- বাবা ডোন্ট টাচ মাই ফোন। দীর্ঘশ্বাসতো বের হবেই।


শুধু ডিভাইস না। ডিভাইসের সাথে   মূল সমস্যা হলো অবাধ স্বাধীনতা আর মাত্রাতিরিক্ত প্রাচুর্য্য।


গত পরশু নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন। সন্তানরা এখন বড়জনদের সম্পূর্নভাবে ইগনোর করে। নতুন জেনারেশন তৈরি হয়েছে। এদেরকে বলে "ফেইস অফ" জেনারেশন। সারাক্ষণ ডিভাইসে চোখ বুুঝে থাকে, তাই তাদের  মুখ আর দেখা যায়না। গার্লফ্রেণ্ড, বয়ফ্রেণ্ড, ক্যারিয়ার আর ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজম- এই চারটা নিয়েই এদের জীবন। তৈরি হচ্ছে একটা স্বার্থপর প্রজন্ম।


শৈশবে স্কুল থেকে ফিরে খাবার চেয়েছি। মা বলেছেন- খাবার রেডি হয়নি। অপেক্ষা করো। এই অপেক্ষাটা জীবনে ধৈর্য্যের প্রথম পাঠ শিখিয়েছে। একটা ডিম ভাইবোনে মিলে ভাগ করে খেয়েছি। এটা পারষ্পরিক সৌহার্দ্যের শিক্ষা দিয়েছে। মেহমান আসলে মা বলেছেন- বিছানা পেতে মাটিতে ঘুমাও। এটা অতিথিকে  সম্মান করা শিখিয়েছে। 


এখন, গলা অবধি সন্তানরা প্রাচুর্য্যের মাঝে ডুবে আছে। ঘরে খাবার নাই তো কি হয়েছে। ফাস্ট ফুড আছে। ফাস্ট ফুডে যেতে ভালো লাগছেনা।  অনলাইনে ডেলিভারির ব্যবস্থা আছে। এক রুমে তিন চার ভাই বোন ঘুমাবে - এটা এর কল্পনাও করতে পারেনা। সবকিছুতেই এটা আমার রুম, এটা আমার ফোন, এটা আমার গাড়ি। শুধু আমি আর আমার।  চারপাশে শুধু আই আর মাই।


শৈশবে স্কুলে দীর্ঘ  ছুটি হলে দাদা, দাদী, নানা, নানুই ছিলো  আমাদের  সমস্ত সুখের আধার।  জ্যোৎস্না রাতে তাদের  গল্পের সাথি হয়ে কত নদী, কত পাতালপুরি, কত স্বপ্নের জগৎ পাড়ি দিয়ে এসেছি। দাদা-দাদীর কোলে মাথা রেখেই আমাদের প্রজন্ম রাত পার করে দিয়েছে। এখনতো অনেকেই দাদা-দাদীকে সাথে পায়না। আর যারা পায় তারাও বাহুল্য মনে করে। বুড়ো মানুষের নিঃসঙ্গতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ডিভাইস। সেদিন দেখলাম- ছেলে  বসে আছে দাদীমার পাশে। কিন্তু তার সমস্ত জগত ডিভাইসে ডুবে আছে। বুঝাই যাচ্ছে- সে দাদির কাছ থেকে সরে যেতে পারলেই যেন মুক্তি পায়। অনেকে আবার নিজ বাড়িতে এসে যে দাদা-দাদি কয়েকদিন থাকবে এটাও পছন্দ করেনা। হায় প্রজন্ম। 


নিক ভ্যুজিচিকের মতো বিশ্ব বিখ্যাত ফিলানথ্রোপিস্টের কথা- সন্তানকে শুধু গল্প, উপন্যাস আর ছবিতে দুঃখ, কষ্ট দেখালে হবেনা।  ছবি আর রুপকথার মানুষ না, সমাজের দীন দুঃখি মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে তাদের পরিচয় করাতে  হবে।  নিজের জীবন থেকে তারা যদি মানুষের যন্ত্রণা  উপলব্ধি করতে না পারে। তবে তারা হয়তো কর্মক্ষেত্রে সফল হবে। কিন্তু সেই সফলতা সমাজের কোনো কাজে লাগবে দূরের কথা, নিজের পরিবারেরই কাজে লাগবেনা। বিশেষ দিনে একটা কার্ড পাঠানোকেই এরা দায়িত্ব মনে করবে। বড় ক্যারিয়ার নিয়ে এরা বড় মানুষ হবে, দামী বাড়ি, গাড়ি হবে। কিন্তু  ভিতরে ভিতরে এরা স্বার্থপরতার  এক ভয়াবহ দানব হয়ে গড়ে ওঠবে। 


কিন্তু এর বাইরে যে ব্যতিক্রম নেই তাও একেবারে  নয়। এই ঘটনাটি হৃদয়কে একেবারে বিগলিত করে দিয়েছে।


মা সন্তানকে নিয়ে স্কুলে যাবেন। আজকে তার গণিত পরীক্ষা। ঘরের দরজা খুলে মা  বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকক্ষণ। সন্তান বের হয়ে আসছেন না। মা ঘরে এসে দেখেন- 

সন্তান  বুড়ো দাদীমার পা নিজের কোলে নিয়ে দাদীমাকে পরম যত্নে  মোজা পরিয়ে দিচ্ছে।


মা ঘরে ডুকে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন- আমার ছেলে পরীক্ষার খাতায় কি পাবে জানিনা। তাতে আমার অতো দুঃখও নেই। কিন্ত মানবিক মানুষ হওয়ার খাতায় সে আজ আমার হৃদয় জয় করে নিয়েছে। 


পাঠ্যবইয়ের প্রথম শিক্ষা দেয়া হয় স্কুলে। আর  মানবিক মানুষ হওয়ার প্রথম পাঠ শুরু হয় ঠিক এইভাবে আপন গৃহে।


ছবিঃ নেট থেকে সংগৃহীত। বারো ঘন্টার  দীর্ঘ রেলপথের যাত্রায় পিতা কোল পেতে দিয়েছেন। আর সেই কোলে মাথা রেখে স্ত্রী আর সন্তান পরম সুখে ঘুমিয়ে আছে।

Comments

Popular posts from this blog

গতির কথা | ৮ম শ্রেণি | বিজ্ঞান | ১ম অধ্যায়

ডিজিটাল প্রযুক্তি | ৭ম শ্রেণি | ১ম অধ্যায় | সংক্ষিপ্ত

ডিজিটাল প্রযুক্তি | ৭ম শ্রেণি | ২য় অধ্যায় | সংক্ষিপ্ত